ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী হলো এমন একটি সুরক্ষাবলয়, যার মাধ্যমে সমাজের অসহায়, দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষকে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়। আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের সামাজিক নীতির এটি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদিও সামাজিক নিরাপত্তার ধারণা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুসংগঠিত রূপ পেয়েছে, এর শেকড় প্রাচীন সভ্যতাতেই নিহিত।
প্রাচীন মিসর, গ্রিস, রোম, চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন সভ্যতায় দরিদ্র সহায়তার নজির পাওয়া যায়। পরবর্তীতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬২২ সালে স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে যে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলে এ ব্যবস্থা সুসংগঠিতভাবে পরিচালিত হয়ে মানবকল্যাণে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাতের ভূমিকা
ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বিশ্বমানবতার জন্য বড় অভিশাপ। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমাতে ইসলাম একটি সুসংহত সম্পদ বণ্টনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে—জাকাত।
ইসলামে ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত অংশ (৪০ ভাগের ১ ভাগ বা ২.৫ শতাংশ) দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ বাধ্যতামূলক। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে,
“যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান, কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে।”
এ নীতির মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং দারিদ্র্য দূরীকরণই জাকাত ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য।
ঋণগ্রস্ত, অনাথ, বিধবা, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও অক্ষম ব্যক্তিদের মৌলিক চাহিদা পূরণে জাকাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিকভাবে জাকাত আদায় ও বণ্টন হলে সমাজে অন্নহীন, বস্ত্রহীন বা আশ্রয়হীন মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা
বর্তমানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জাকাত বিতরণের প্রচলন থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অনেক সময় জাকাত বিতরণ সাময়িক সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকে, যা গ্রহীতাকে আত্মনির্ভরশীল করার পরিবর্তে নির্ভরশীল করে তোলে।
জাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো—গ্রহীতাকে এমনভাবে সহায়তা করা যাতে তিনি ভবিষ্যতে দাতার পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্রদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সহায়তা চাইতে হয়, যা সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।
অতএব, সরকারি উদ্যোগে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে জাকাত সংগ্রহ ও পরিকল্পিত বণ্টনের ব্যবস্থা করা হলে তা জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে। এতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং লক্ষ্যভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচন নিশ্চিত করা সম্ভব।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য
জাকাত শুধু ধর্মীয় অনুশাসন নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা। স্বর্ণ-রুপা, নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য, কৃষিজ উৎপাদন (উশর), খনিজসম্পদসহ বিভিন্ন সম্পদের ওপর জাকাত আরোপের মাধ্যমে সম্পদের প্রবাহ সমাজের নিম্নস্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়।
কোরআনের বহু স্থানে সালাতের পাশাপাশি জাকাত আদায়ের নির্দেশ এসেছে—যা এর গুরুত্বের প্রমাণ বহন করে। ইতিহাসে হযরত আবু বকর (রা.) জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, যা জাকাত ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।
সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জাকাত একটি শক্তিশালী ও কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন—
- সুষ্ঠু ও বাধ্যতামূলক সংগ্রহব্যবস্থা
- স্বচ্ছ ও পরিকল্পিত বণ্টন
- আত্মনির্ভরশীলতা ভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচি
- সরকারি তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
যদি এভাবে জাকাত ব্যবস্থাকে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বিত করা যায়, তবে দারিদ্র্য বিমোচনে তা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে।