ঢাকা | ১৭ মার্চ ২০২৬
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ হোক—এটাই বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা। তবে যুদ্ধের অবসান কীভাবে হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অবস্থান ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত লক্ষ্য ও স্বার্থই নির্ধারণ করছে এই যুদ্ধের গতিপথ।
যুক্তরাষ্ট্র: লক্ষ্য ও দ্বিধা
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য কখনো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, কখনো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন—এমন বিভিন্ন অবস্থানের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
ওমানের মধ্যস্থতায় জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি হতো—ইরানে একটি নতুন, তুলনামূলকভাবে কম সংঘাতমুখী সরকার প্রতিষ্ঠা। তবে বাস্তবে সে ধরনের কোনো লক্ষণ এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে তেলের দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালি-এ অস্থিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে চাপ বাড়াচ্ছে।
ইরান: টিকে থাকাই কৌশল
ইরান দ্রুত যুদ্ধের অবসান চাইলেও তা নিজেদের শর্তে।
তাদের মূল লক্ষ্য—
- শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা
- সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি হারানো এড়ানো
- আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখা
মোজতবা খামেনি-কে নতুন নেতৃত্বে আনার বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান আপসের চেয়ে কঠোর অবস্থানে থাকতে পারে।
হরমুজ প্রণালির ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ইরানের বড় শক্তি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতে টিকে থাকাকেই ইরান অভ্যন্তরীণভাবে “বিজয়” হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
ইসরাইল: নিরাপত্তা অগ্রাধিকার
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের কাছে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা বড় নিরাপত্তা হুমকি।
ইসরাইলের লক্ষ্য—
- ইরানের মিসাইল ও ড্রোন অবকাঠামো দুর্বল করা
- সামরিক ঘাঁটি ও কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করা
- ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনকে ব্যয়বহুল করে তোলা
ইসরাইল মনে করে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তাদের অস্তিত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
উপসাগরীয় দেশ: দ্বৈত উদ্বেগ
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলো শুরুতে সরাসরি সংঘাত চায়নি।
তবে বর্তমানে তারা—
- ইরানের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে
- আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন
- অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় আছে
এই দেশগুলো একদিকে সংঘাত এড়াতে চায়, অন্যদিকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ: অনিশ্চিত সমাপ্তি
এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—
- সামরিক শক্তির ভারসাম্য
- কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি
- বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ
ইতিহাস বলছে, এ ধরনের বড় সংঘাত সাধারণত সম্পূর্ণ বিজয় বা পরাজয়ের মাধ্যমে নয়; বরং জটিল সমঝোতার মধ্য দিয়েই শেষ হয়।
উপসংহার
ইরানকে ঘিরে এই যুদ্ধ কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, নিরাপত্তা রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের একটি জটিল সমীকরণ।
প্রতিটি পক্ষই নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট—আর সেই হিসাব-নিকাশই নির্ধারণ করবে এই যুদ্ধের শেষ পরিণতি।