ঈমান ও সমাজ বিধ্বংসী এক ব্যাধি শান্তিময় আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে ইসলাম কিছু বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছে। তন্মধ্যে অন্যের সম্মান রক্ষা করা, দোষত্রুটি গোপন রাখা এবং হিংসা বিদ্বেষ পরিত্যাগ করে পরস্পর ভাই ভাইয়ের মত চলা ইত্যাদি। বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে পরস্পরের সম্মানহানি করা, দোষত্রুটি চর্চা করা,মিথ্যা অপবাদ দেওয়া ; এগুলো মহামারী আকার ধারণ করেছে। যার ফলে পরস্পর মিল মহাব্বত ও সেতুবন্ধন বিনষ্ট হয়ে সমাজে নানা বিশৃঙ্খলা আর অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। তাই আগের মতো সামাজিক মিলবন্ধনের সুন্দর দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। সামাজিক সেতুবন্ধন বিনষ্টের যে সকল কারণ রয়েছে, তন্মধ্যে মিথ্যা অপবাদ অত্যন্ত মারাত্মক একটি বিষয়। বর্তমান সময়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সম্মানহানির প্রবণতা এতই বেড়েছে যে, কাউকে ঘায়েল করার বড় হাতিয়ারই যেন এই অপবাদ। কোন বিষয়ে সত্যতা যাচাই না করে অনুমানের ভিত্তিতে কারো বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখির মাধ্যমে বা প্রকাশ্যে বলাবলি করে অপবাদ আরোপ করা যেন একেবারে তুচ্ছ বিষয় পরিণত হয়েছে। অথচ পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরীফে অপবাদকে একটি মারাত্মক গুনাহ আখ্যায়িত করে এর কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ হয়েছে। অপবাদ কাকে বলে? শাব্দিক অর্থে ইফতিরা বা অপবাদ বলতে বদনাম রটানো, দুর্নাম রটানো বা মিথ্যা বলাকে বুঝায়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.)বলেছেন – قال عبد الله بن عمر رضي الله عنهما : البهتان : ان تقول ما ليس فيه অপবাদ হল – কারো বিষয়ে এমন কথা বলা, যা তার মধ্যে নেই। ( আস- সামত ইবনু আবিদ্দুনিয়া রহ., পৃষ্ঠা – ২০৯)। হযরত ফুজায়ল (রহ.) বলেন – “ শেষ জামানায় কিছু লোক থাকবে, যারা অধিক পরিমাণে অপবাদ দেবে এবং পরনিন্দা করবে।তোমরা তাদের থেকে সতর্ক থেকো। নিশ্চয় তারা সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ; তাদের হৃদয়ে ইসলামের কোনো আলো নেই। তারা পাপিষ্ঠ, তাদের কোন আমোলই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। ” ( আত- তাওবীহ ওয়াত – তামবিহ ২১৭) অপবাদের সামাজিক ক্ষতি অপবাদ আরোপ করা ইসলামে যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি সামাজিকভাবে ও এটি অত্যন্ত ঘৃণিত ও ন্যাক্কারজনক কাজ। অপবাদ একজন মানুষকে কোন কারণ ছাড়াই সমাজের কাছে অপরাধী হিসেবে তুলে ধরে এবং তার সম্মান ও ব্যক্তিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অপবাদের মাধ্যমে নির্দোষ ব্যক্তির চরিত্রে কালিমা লেপন করা হয়। অপবাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো এর দ্বারা সমাজে ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটে। অথচ কারো সম্মানহানি করার অধিকার অন্য কারো নেই। অপবাদে মুমিনের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় কারো বিপক্ষে মিথ্যা দোষারোপ করতে হিংসা বিদ্বেষ মানুষকে প্ররোচিত করে। মানুষ সাধারণত পরশ্রীকাতর হয়ে এবং নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে মিথ্যা দোষারোপ আর অপবাদের মতো মারাত্মক অপরাধে লিপ্ত হয়। এই সমাজে যারা অপবাদ রটায়, তাদের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য থাকে এর দ্বারা ব্যক্তির সম্মানহানি করে সমাজের চোখে তাকে কলুষিত করা এবং তার ব্যক্তিত্বকে খাটো করে সম্মানহানি করা।অথচ একজন মুমিনের সম্মানহানি মারাত্মক গুনাহের কাজ। হাদিস শরীফে একজন মুমিনের মর্যাদাকে পবিত্র কা’বার চেয়েও অধিক মূল্যবান বলা হয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ( সা.) এরশাদ করেন – والذي نفس محمد بيده لحرمة المؤمن اعظم عند الله حرمة منك “ হে কাবা! নিশ্চয়ই সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মোহাম্মদ ( সা.) এর প্রাণ! একজন মুমিন আল্লাহর কাছে তোমার চেয়ে ও অধিক মর্যাদাবান ”। ( ইবনে মাজাহ – ২/ ১৮৩০) অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন- কোন ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে সে তার মুসলিম ভাই কে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের জীবন, সম্পদ ও সম্মানে হস্তক্ষেপ করা হারাম। (সহীহ মুসলিম -২৫৬৪) আরো এরশাদ হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.)ইরশাদ করেছেন- “ সুদ ( খাওয়ার পাপ হলো) ৭২ প্রকার। যার মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হল মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মতো! আর সবচেয়ে ভয়াবহ(পাপ) সুদ হলো- কোনো ব্যক্তির তার মুসলিম ভাইয়ের সম্মানহানিতে জড়িয়ে পড়া।” ( সিলসিলাহ সহিহাহ- ১৮৭১)। অপবাদের ভয়াবহ শাস্তি যে ব্যক্তি তার অপর ভাইয়ের ইজ্জত খাটো করে, তার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন – ما من امرىء يخذل امرأ مسلما في مو ضع تنتهك فيه حرمته و ينتقص فيه من عرضه إلا خذله الله في مو طن يحب فيه نصرته অর্থ – কোনো মুসলমান অপর কোনো মুসলমানকে যদি এমন স্হানে লাঞ্ছিত করে, যেখানে তার সম্মানহানি হয়,আল্লাহ তাকে এমন স্হানে লাঞ্ছিত করবেন, যেখানে তার সাহায্যপ্রাপ্তির আশা ছিল। ( আবু দাউদ – ৪৮৮৪)। অপবাদের গুনাহের ভয়াবহ শাস্তির কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন- والذين يؤذون المؤمنين والمؤ منات بغير ما اكتسبوا فقداحتملوا بهتانا و اثما مبينا অর্থ – যারা মুমিন নর ও মুমিন নারীদেরকে বিনা অপরাধে কষ্ট দান করে, তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে। (সূরা আহযাব- ৫৮) রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন – من قال في مؤمن ما ليس فيه اسكنه الله ردغة الخبال حتي يخرج مما قال যে ব্যক্তি কোনো মুমিন সম্পর্কে এমন কথা বলে যা তার মধ্যে নেই ( মিথ্যা অপবাদ দেয়) আল্লাহ তায়ালা তাকে জাহান্নমীদের আবর্জনার মধ্যে বসবাস করাবেন। যতক্ষণ না সে তার বলা কথা থেকে তওবা করে ফিরে আসে।( আবু দাউদ – ৩৫৯৭)। হযরত আলী (রাযি.)থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন – عن علي قال: البهتان علي كنز ” البراء اثقل من السموات. الحكيم العمال ٣/ ٨٠٢. رقم الحديث ٨٨١٠ অর্থ – “ নির্দোষ ব্যক্তির উপর অপবাদ আরোপ আকাশের চেয়েও ভারী।” অপবাদ প্রতিহত করার নির্দেশ : কোনো মুসলমানের মানহানি হতে দেখলে তা প্রতিহত করতে বলা হয়েছে, নবী (সা.)বলেছেন – “ যে লোক তার কোন ভাইয়ের মান- সম্মানের উপর আঘাত প্রতিরোধ করে, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তায়ালা তার মুখমন্ডল হতে জাহান্নামের আগুন প্রতিরোধ করবেন।” উপরোক্ত কুরআন ও সুন্নাহ সমূহ থেকে মুমিনের সম্মান এবং সম্মানহানির ভয়াবহতা সুস্পষ্টভাবেই বুঝা যায়। অপবাদের গুনাহ থেকে বাঁচার উপায় সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযি.) বলেন, যে ব্যক্তি গীবত থেকে বাঁচলো, সে মিথ্যা থেকে বাঁচলো,আর যে মিথ্যা থেকে বাঁচলো, সে অপবাদের গুনাহ থেকে বাঁচলো। ( বায়হাক্কি শুয্বুল ঈমান – ৬৭৮৩) অপবাদ বান্দার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়। কারো ব্যপারে অপবাদ দেওয়া হলে সে ক্ষমা না করলে আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়া যাবে না। সুতরাং আমাদের উচিত হলো, কাউকে অপবাদ দিয়ে থাকলে তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। অপবাদের মতো মারাত্মক গুনাহ থেকে বাঁচতে এবং একটি সুন্দর সমাজ গঠনে নিম্নলিখিত ব্যবহারিক উপায়গুলো অনুসরণ করা যেতে পারে- ১. যাচাই – বাচাই ছাড়া কোনো খবর বিশ্বাস না করা : কোনো তথ্য বা সংবাদ পাওয়ার পর তার সত্যতা যাচাই না করে তা বিশ্বাস বা প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত খবর সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। ২. সন্দেহ ও কুধারণা পরিহার: মানুষের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখুন।মনে রাখবেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “ হে মুমিনগন! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো। কারণ, কোনো কোনো অনুমান পাপ।”(সূরা হুজুরাত – আয়াত ১২)। নিজেকে সংশোধনে ব্যস্ত রাখা : অন্যের দোষ খোঁজা বা আলোচনা করার পরিবর্তে নিজের ত্রুটি – বিচ্যুতি দূর করার চেষ্টা করুন। যখন আপনি নিজের আত্ম- সংশোধনে মনযোগী হবেন, তখন অন্যের প্রতি অপবাদ দেওয়ার প্রবণতা কমে যাবে। ৪. অন্যের সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকা: একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, অন্যের সম্মান রক্ষা করা। যদি দেখেন কেউ মিথ্যা অপবাদের শিকার হচ্ছে বা তার সম্মানহানি হচ্ছে, তাহলে সাধ্যমতো তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করুন। ৫. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সতর্ক থাকা: বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অপবাদ ছড়ানোর একটি বড় মাধ্যম। অনলাইনে কোন কিছু শেয়ার করার আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করুন এবং এমন কোনো পোস্ট বা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন যা অন্যের সম্মানহানি করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে হিংসা – বিদ্বেষ ও অপবাদের মারাত্মক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ঈমান ও সমাজ বিধ্বংসী এক ব্যাধি শান্তিময় আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে ইসলাম
Related Posts
ডেইলিক্রাইসিস বিডি
আপডেটের জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
আমাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের
সর্বশেষ খবর জানতে সাবস্ক্রাইব করুন
Office Address
29, Toyenbee Circular Road (5th Floor),
Dainik Bangla Moore,
Motijheel C/A, Dhaka-1000